১৫ জুলাইয়ের কালরাত্রিতে কী হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগরের!

Published from Blogger Prime Android App"১৫ জুলাইয়ের কালরাত্রিতে কী হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগরের!"

.

রাত আনুমানিক এগারোটা। আমরা আন্দোলনে তখন। ভিসির বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়েছি। স*ন্ত্রাসী হাম*লার প্রতিবাদে বিক্ষোভ। ভিসির কাছে জবাব চাই। চাই নিরাপত্তা। ভিসি সাহেব তার প্রাসাদের ভিতরে অবস্থান নিয়েছেন। বের হওয়ার নাম নেই।

তখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ। আমরা কেবল স্লোগানের সাথে মুখ নাড়াই। কোথ্থেকে যেন ভাইয়েরা খবর পেল ছাত্রলীগ বহিরাগত স*ন্ত্রা*সী ভাড়া করে এনেছে। ক্যাম্পাসের চারদিক থেকে পিকআপ ঢুকছে। পিক-আপ ভর্তি মানুষ আর অস্ত্র। লাঠি, পেট্রোল বোমা, কাচের বোতল, ইটের টুকরা ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা সবাই শংকিত কিছুটা। আমাদের হাতে তেমন অস্ত্র নেই যে প্রতিরোধ করতে পারবো। লোকজনও ধীরে ধীরে কমছে।

ভিসি সাহেব বের হলেন এক পর্যায়ে। বের হয়ে পুতুলের মতো বললেন কেবল, আমরা দেখছি। গায়ের জোর দেখিয়ে ভিতরে চলে গেলেন আবার। আমরা ভয়ে। স্যারদের জানাচ্ছি পুলিশ আনতে। আমাদের বাঁচাতে। নিরুপায় আমরা, ততক্ষণে পিঁছু হটলেও সন্ত্রাসীদের সামনে গিয়েই পড়বো। প্রতিরোধ করারও শক্তি ছিল না। পুলিশ আসতে দেরি করছে।

সন্ত্রা*সী-ছাত্রলীগ মিলে ছুটে আসছে। মিছিল নিয়ে। অস্ত্র নিয়ে। আমরা ভয়ে ভিসির বাসভবনের তালা ভেঙে ঢুকলাম তার উঠোনে। ঢুকেই গেইট লাগানো হলো। পুলিশের গাড়ির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ভাবলাম এবার বোধহয় রক্ষা। পুলিশ আমাদের বাঁচাতে এসেছে। ভয় নাই আর।

তখন রাত কেবল গভীর হলো। আমার বোনদেরকে বলা হলো, তোমাদেরকে আগে হলে দিয়ে আসি। গাড়িতে বসো, পৌঁছিয়ে দিচ্ছি আমরা। তারপর ছেলেরা যাবে। আমার বোনেরা গর্জন দিয়ে বললো, আমাদের ভাইদের একা রেখে আমরা কোথাও নড়বো না। বাঁচলে একসাথে, মরলেও তাই। শুনে চোখে দুফোঁটা পানি এলো। যেন মায়ের পেটের বোন আমাদের। আমরা একসাথে মরতে প্রস্তুত।

আমরা বোকার স্বর্গে তখন। পুলিশ যে আমাদের বাঁচাতে পারবে না সেই বুঝ আমাদের হলো কিছুক্ষণ পর। আমাদের দিকে ছোড়া হচ্ছে কাঁচের বোতল, ইট। ওরা দাঁড়িয়ে দেখছে। যেন কিছুই করার নেই তাদের। কেবল দেখতেই এসেছে কি হয় না হয়। 

আমাদের পরিস্থিতি বলি একটু। বাসার দুইদিকে গেইট। একদিকে পুলিশ আর কিছু সন্ত্রা*সী মিলে কথা বলছে। আলোচনা করছে কিছু একটা নিয়ে। আলোচনার মাঝেমধ্যে উত্তেজিত হয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসার প্রবণতা, কাচের বোতল ছোড়া, চলছেই। আরেকদিকের গেইটটায় শুধুই সন্ত্রা*সীদের দখলে। পুলিশ আসছে না এদিকে, হয়তো ভয়ে নয়তো হুকুমে। গেইটটার তালা ভাঙার চেষ্টা চলছে তখন। চলছে ইট নিক্ষেপ, সাথে পেট্রোল বোমা।

প্রায় আশি হতে একশ জন ভাইবোন আমরা কোণঠাসা। কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না। কয়েকশ সন্ত্রা*সীকে প্রতিহত করা সাধ্যে নেই মেনে নিচ্ছি। ভিসির বাসার ভিতরে ঢোকার গেইটে ধাক্কা চলছে। আহাজারি চলছে। ভিসি স্যারকে অনুরোধ করা হচ্ছিলো, দরজাটা খুলেন, আমাদেরকে ভিতের নিয়ে বাঁচান। খোদার দোহাই লাগে বাঁচান। খুললো না দরজাটা। ভাঙার চেষ্টাও বৃথা।

আমরা পরাজয় বরণ করে নিলাম মনে মনে। রক্ষা নেই। আমরা গাদাগাদি হয়ে গেলাম। বসে, হেলে, মাথায় হাত দিয়ে। একজনের উপর আরেকজন। মাথা নিচু করে রাখার বৃথা প্রচেষ্টা। তখন মাথায় ঘুরছিল গণহত্যার ইতিহাস। ২৫শে মার্চ ঘুরছিলো।

ইট, পাটকেল, লাঠির আঘাতে মরবার কষ্ট কেমন হবে সেটাও ভাবছি। ভাবছি ওরা কোথায় আঘাত করে মারবে? মাথায় না বুকে? কতক্ষণ যন্ত্রণার পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বো? আমি শুয়ে পড়বো এখন? সে জায়গা কই? তখনই ভিতর থেকে এক আপু বললো, আমার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। শ্বাসরোধে মারা যাচ্ছি। সাথে আরো কয়েকজন বললো আমিও নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। এক ভাইকে বলতে শুনলাম আমার পা টা ভেঙে গেল রে!

আমার কোনোকিছু অনুভব হচ্ছিলো না যেন। কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে, তবু মাথা নাড়াতে ইচ্ছে করছে না। নিজের সাথেও যুদ্ধ চলছিল। সবাই কয়েকবার চিল্লিয়ে উঠলাম, আল্লাহু আকবার।

রাতটা দুনিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘতম। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি। সময় যেন আটকে আছে। আগাবে না আর।
আমার মৃত্যুর প্রতি তীব্র ভয়। রক্ত দেখলেই মাথা ঘুরায়। অসহ্য যন্ত্রণা হয়। অথচ তখনো আমার চোখে পানিও ছিল না। কি শক্ত মানুষ হয়ে উঠলাম। একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছি শুধু। অসহায়ের মতো তাকিয়েই আছি।

হঠাৎ আমার মনে পড়লো মায়ের মুখ। আব্বুর চেহারা। তাদের বলা সতর্কবাণী। কড়া শাসন। শেষবারের মতো যেন। আমার তো কান্না করা উচিত এখন।
.
কয়েকজন স্যার ছিলেন আমাদের সঙ্গে। ওনাদের কৃতজ্ঞতা জানানোয় কমতি নেই। ওনারা সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, আমরা আছি। যদিও ওনারা থেকেও লাভ নেই। তবে একটা স্বস্তি ওনারা আমাদের রেখে পালিয়ে যান নাই।

ফোনে চার্জ নেই। কাউকে খবর দিতে পারছি না। পারছি না কাউকে ফোন দিয়ে বলতে, আমি বোধহয় শেষ। বাড়িতে শেষবারের মত কথা বলার সাহস বা সুযোগ কোনোটাই ছিল না।

রাত আড়াইটা আনুমানিক।
আমি, আমরা তখনো জানিনা আমরা এখান থেকেও বেঁচে ফিরতে পারি। আমাদের বাঁচাতে পারে কেউ। কেননা আমরা জানি আমরা তো সিনেমায় নই। আমরা বাস্তবতায়। আমরা জালিমদের কবজায়।

হুট করে একবার খবর পেলাম ছাত্রলীগের সবাই চলে গিয়েছে। আমরা এখন ফিরে যেতে পারি। অবিশ্বাস্য লাগলো প্রথমে। পুলিশের মুখের কথা তো! এ কোন ষড়যন্ত্র আবার। বাইরে নিয়ে মারবে তবে?

না। ভুল ভাঙলো। সত্যই সন্ত্রা*সীরা চলে গিয়েছে। আমাদের ভাইয়েরা বাঁচাতে এসেছে। আমার জাহাঙ্গীরনগরের ভাইয়েরা। যেটা পুলিশ এতক্ষণে পারেনি। কয়েকঘন্টায়ও। পারেনি সন্ত্রাসীদের দমাতে। অথচ আমাদের ভাইয়েরা তাদেরকে কেবল দমায় নি, তাড়িয়েও দিয়েছে। চোরের মতো পালানোর রাস্তা খুঁজেছে ওরা।

বন্ধন বোধহয় এটাকেই বলবে মানুষ। এটাই একতা। এই অংশটুকু যুগে যুগে ইতিহাস হয়ে রইবে। আমাদের জাবিয়ানদের বুকে গর্বিত ভাব আনবে ঠিক!

গেইট দিয়ে যখন ঢুকলো আমার ভাইয়েরা। ঢুকে যখন চিল্লাতে থাকলো। বজ্রধ্বনিতে শুনলাম ওরা বলছে, তোদের ভাইয়েরা মরে যায়নি। আমরা থাকতে কেউ মারতে পারবে না তোদের। ভয় নেই। আসুক এবার দেখি।

ঠিক তখনই। তখনই চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়তে শুরু করলো। আর থামে না। কাঁদতে লাগলাম আমি আমরা সবাই। সামনে যে ভাইকে পাচ্ছি, বুকে জড়িয়ে নিচ্ছি কাঁদতে কাঁদতে। ওরাও কাঁদছে, আমাদেরকে জীবন্ত ফিরে পাওয়ার আনন্দে কাঁদছে। আর আমরা কাঁদছি দ্বিতীয় জন্মের শুরুতে।
জন্ম তারিখঃ ১৫ জুলাই দিবাগত রাত, ২০২৪।

Comments