জনজীবনে খেলাধুলা ও অনলাইন আসক্তি
ঘন্টার পর ঘন্টা ক্রিকেট খেলা এবং তারপর গ্রীষ্মে গাছের ছায়ায় বন্ধুদের সঙ্গে একটু বসে থাকা, এসি রুমে বসে ভিডিও গেম খেলার চেয়ে অনেক ভালো!
শিক্ষার্থী ও মোবাইল আসক্তি
পৃথিবীজুড়ে করোনা মহামারির কারণে অর্থনীতি ধ্বংসের পাশাপাশি ঝিমিয়ে পড়েছে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাও। এর প্রভাব থেকে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। আর শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আবার বাসা বেঁধেছে নতুন এক উপদ্রব মোবাইল ফোন আসক্তি। অনলাইন ভিত্তিক ক্লাসের নামে অভিভাবকদের তুলে দিতে হয়েছে তাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েদের হাতে এ এক মরণ নেশা। এ নেশার আসক্তির কারণে কিশোর-কিশোরীরা লেখাপড়ার নাম করে দারুণভাবে ঝুঁকে পড়েছে মোবাইলের বিভিন্ন অ্যাপসভিত্তিক গেমস, পর্নোগ্রাফি ভিডিও, পাবজি, ফ্রি-ফায়ারের মতো মরণঘাতি গেমসের নেশাসহ ইউটিউব, লাইকি, ফেসবুক, টুইটারসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি।
এ যন্ত্রটি এমন একটি নেশা, যার কারণে খুনও হতে হচ্ছে। গড়ে উঠছে দেশের বিভিন্ন জায়গার বড় বড় শহরে কিশোরগ্যাংও। পারিবারিক কলহ তো বেড়েই চলেছে। বিবাহিতদের মাঝে বাড়ছে ডিভোর্সের প্রবণতা। তা ছাড়া এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ মোবাইল আসক্তির কারণে গত দুই বছরে স্কুল-কলেজের তরুণ-তরুণীরা চরম মানসিক অস্থিরতায় ভুগছে। ২৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী দিনে ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করে। ২৬ শতাংশ দিনে চার থেকে ছয় ঘণ্টা এবং ৩১ শতাংশ দুই থেকে চার ঘণ্টা দৈনিক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় দিয়ে থাকে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এ ধরনের আসক্তির জন্য অভিভাবকদের রয়েছে অন্যতম ভূমিকা। ছেলেমেয়েদের আবদার এবং বায়না ধরার ফলে অভিভাবকরা অতি উৎসাহী হয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার মানটাকে শক্তিশালী করার জন্য তথ্যপ্রযুক্তির দোহাই দিয়ে প্রযুক্তিগত উন্নতি যাতে করতে পারে সে আশাতেই অভিভাবকরা না বুঝেই তুলে দেন নেশা ও নারীর চেয়েও বেশি শক্তিশালী আসক্তির এ উপকরণ মোবাইল।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে যৌথ পরিবার কাঠামো ভেঙে একক পরিবার তৈরি হওয়ার কারণে আরো বেশি পরিমাণে ছেলেমেয়েরা এই মোবাইলের প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন গবেষকরা। মোবাইল আসক্তির ভয়াবহ এ প্রবণতায় বিশেষ করে উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েরা বর্তমান পরিস্থিতিতে এক বিরাট সংকটকাল অতিক্রম করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষকরা মোবাইল ফোনের সঙ্গে যোগাযোগ হারানোর এই ভয়জনিত অসুখের নাম দিয়েছেন ‘নোমোফোবিয়া’। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ৫৩ শতাংশ এবং ২৯ শতাংশ ভারতীয় তরুণরা এ রোগের শিকার।
অপরদিকে যুক্তরাজ্যের গবেষক বলেছে, মোবাইল অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে চোখের জ্যোতি আনুপাতিক হারে কমে যাবে, এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের চক্ষুবিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে দৃষ্টিশক্তি কমে যাবে। কানে কম শুনবে, আর এ বিষয়টি নির্ভর করবে মোবাইল ব্যবহারকারীর ওপর। কারণ সে কানের কতটুকু কাছাকাছি এটি ব্যবহার করে, উচ্চ শব্দে গান শুনে কি না। এ ছাড়াও শারীরিক বিভিন্ন অসংগতি দেখা দেবে। যেমন শরীরের অস্থিসন্ধিগুলোর ক্ষতি হতে পারে। কমে যেতে পারে শুক্রাণু। গবেষকরা জানান, মোবাইল ফোন থেকে হাই ফ্রিকোয়েন্সির ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন নির্গত হয়। এই ক্ষতিকর তরঙ্গের সঙ্গে মস্তিষ্কে ক্যানসারের যোগসূত্র থাকতে পারে। এ ছাড়া শরীরের অন্য কোষকলা এই ক্ষতিকর তরঙ্গের প্রভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে পুরুষের প্রজননতন্ত্রেরও।
শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে একজন মানুষের প্রতিদিন ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। কিন্তু মানুষের এই ঘুমের সময়টা যদি বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার দখল করে নেয় তাহলে ঘুমের সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে। ইনসমনিয়া এমনই একটি সমস্যা। ইনসমনিয়া বা স্পিং ডিসঅর্ডার বলতে অনিদ্রা বা স্বল্প নিদ্রাকে বোঝায়। এর ফলে মানুষের শরীরে ঘুমের চাহিদা অপূর্ণ থেকে যায়। ইনসমনিয়ার দুই ধরন প্রাথমিক বা স্বল্পমেয়াদি- এ ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ব্যক্তির ঘুমাতে সমস্যা হয় কিন্তু তা শারীরিকভাবে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। স্বল্পমেয়াদি ইনসমনিয়া কিছুদিন অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। অপরটি ক্রমিক বা দীর্ঘমেয়াদি।
অনিদ্রা এক মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, তখন তাকে দীর্ঘমেয়াদি ইনসমনিয়া বলে। এ ধরনের ইনসমনিয়ার কারণ শারীরিক ও মানসিক অবসাদ, অ্যাজমা, আর্থ্রাইটিস, অ্যালকোহল সেবন, ওষুধের কুফল ইত্যাদি। ইনসমনিয়া নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা কিছু নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করেছেন। এরমধ্যে অন্যতম কারণ হলো মাত্রাতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার। আর বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বললেই সবার আগে যে প্রযুক্তির কথা আমাদের মাথায় আসে তা হলো স্মার্টফোন।
যোগাযোগ মাধ্যমের সর্বাধুনিক সহজ প্রযুক্তি হচ্ছে মোবাইল ফোন। এর বিকল্প এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার এড়িয়ে চলবার উপায়ও নেই। তাই এর ব্যবহার অনিবার্য। তবে অপব্যবহার যেন না হয়, দিনকে দিন যাতে ছেলেমেয়েরা এর প্রতি আসক্তি বা ঝুঁকে না পড়ে, সেদিকে নজর দেওয়া খুবই জরুরি। এর ভয়াবহতা বা আসক্তি থেকে ছেলেমেয়েদের দূরে রাখতে হলে তাদের হতে তুলে দিতে হবে আকর্ষণীয় বই, পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন ধরনের ম্যাগাজিন। যোগাযোগ ঘটাতে হবে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। বিনা প্রয়োজনে এর অতিরিক্ত ব্যবহার পরিহার করা বুদ্ধিমানের কাজ। তাই যাতে আমাদের তরুণ সমাজ এর ভয়াবহতায় ধ্বংস না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা অভিভাবকদের জন্য অতীব জরুরি। আমাদের পরবর্তী জেনারেশনকে এ ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে সচেতন হতে হবে অভিভাবকদের। প্রতিরোধের ব্যবস্থাও নিতে হবে সচেতনভাবে- যাতে করে এর প্রভাবে আবার কোনো দুর্ঘটনা না পড়ে উঠতি বয়সের আবেগ প্রবণ ছেলেমেয়েরা।
Sports Courtyard




Comments
Post a Comment