“আমার ছেলে তো শ্রমিক ছিল। কোনো ধরনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। তাহলে কী দোষে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো?”

Published from Blogger Prime Android Appএতিম নুরনাহার বেগমকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন স্যানিটারি মিস্ত্রি মো. ফয়েজ। তাদের সংসার আলো করে ফুটফুটে একটি ছেলে সন্তান আসে। ঢাকার ভাড়া বাসায় ভালোই কাটছিল তাদের দাম্পত্য জীবন।

পৃথিবীতে নুরনাহারের একমাত্র আপনজন ছিল তার স্বামী। সেই আপনজনকে কেড়ে নিয়েছে গুলি। নিভে গেছে ৩২ বছর বয়সী ফয়েজের তাজা প্রাণ। এখন তাকে হারিয়ে দিশেহারা গোটা পরিবার।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নের পশ্চিম ঝাউডগি গ্রামের কাঠমিস্ত্রি আলাউদ্দিন ও সবুরা বেগম দম্পতির সন্তান ছিলেন ফয়েজ।

ঢাকার যাত্রাবাড়ী সাইনবোর্ড এলাকায় ২১ জুলাই সন্ধ্যায় গুলিতে তার মৃত্যু হয়। ২২ জুলাই জানাজা শেষে ফয়েজকে গ্রামের বাড়ির পাশে দাফন করা হয়।

মৃত্যুর ঠিক আগে মা সবুরা বেগমের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল ফয়েজের। সে স্মৃতি এখনও দগদগে মায়ের মনে।

ছেলের কথা বলতে গিয়ে ডুকরে ওঠেন সবুরা বেগম। বলছিলেন, “ঘটনার ঠিক আগ মুহূর্তে আমি ফয়েজকে কল দিয়েছিলাম। সে বলছিল, কাজ শেষে বাসায় যাচ্ছে। এরপর বলে, মা রাস্তায় অনবরত গুলি হচ্ছে। এখন ফোন রাখো

“এরপর আর তার কথা শুনতে পাইনি। সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। বারবার কল দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।”

কথাগুলো বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।তিন ভাইবোনের মধ্যে ফয়েজ ছিল সবার বড়। তার কবরের পাশে বার বার ছুটে যাচ্ছেন মা সবুরা। আর ছেলের শোকে হাউমাউ করে কাঁদছেন। প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও খুঁজে পাচ্ছেন না।

ফয়েজের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি ঢাকায় স্যানিটারি মিস্ত্রি হিসেবে দৈনিক মজুরিতে কাজ করতেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত সংসারে জন্ম ফয়েজকে অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে মালদ্বীপ যেতে হয়েছিল। এরপর ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় চাকরি হারিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাকে। ফের পরিবারের হাল ধরতে চাকরি খুঁজতে তিনি ঢাকায় যান।

সেখানে স্যানিটারি মিস্ত্রি (পাইপ ফিটিংস) হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর মধ্যেই গাজীপুরের টঙ্গীর বাসিন্দা এতিম নুরনাহারকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। ১৮ মাস আগে তাদের সুখের সংসার আলো করে আসে এক ছেলে। ফয়েজ সন্তানের নাম রাখেন রাফি মাহমুদ।

Published from Blogger Prime Android App
ফয়েজের বাবা আলাউদ্দিন বলেন, “আমার ছেলে তো শ্রমিক ছিল। কোনো ধরনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। তাহলে কী দোষে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো? সে তো আর ফিরে আসবে না। তার স্ত্রী-সন্তানকে কে দেখবে। বউটাও এতিম। আমি ফয়েজ হত্যার বিচার কার কাছে চাইব?”

ছোট রাফিকে নিয়ে সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে অনবরত সেটাই ভেবে চলেছেন নুরনাহার। স্বামীর মরদেহ দাফন শেষে শিশু রাফিকে নিয়ে গাজীপুরের টঙ্গীতে খালার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে নুরনাহার বলেন, “২১ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাসায় ফেরার পথে সাইনবোর্ড এলাকায় গুলিতে আমার স্বামী মারা যায়। আমার বাবা-মা, ভাই-বোন তো কেউই নেই। ফয়েজ আমাকে বিয়ে করে আপন করে নিয়েছিল। পৃথিবীতে সেই আমার একমাত্র আপনজন ছিল; একমাত্র আশ্রয় ছিল।

“তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। এখন আমার আর কেউ রইল না। কে দেখবে আমার ছোট্ট রাফিকে। কী দোষ ছিল ফয়েজের, কে দেবে এর জবাব? আমি এখন বড় একা।”


Comments

Popular posts from this blog

আপনাদের মতামত -০৬, হাসিনুল কবির রিফাত

১৫ জুলাইয়ের কালরাত্রিতে কী হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগরের!